বয়ঃসন্ধি কাল জনপ্রিয় বিষয়সমূহ পজিটিভ প্যারেন্টিং

পজিটিভ প্যারেন্টিং

আপনার বাড়ি, গাড়ি, অর্থ বিত্ত সবই আছে কিন্তু ততক্ষণ নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে ভাবতে পারবেন না, যতক্ষণ আপনার সন্তান একজন সফল মানুষ না হচ্ছে। সব মা-বাবারই তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে, তার সন্তান হোক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান। সবাই নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন সন্তানকে-এ ব্যাপারেও সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সন্তানের জন্যে তারা সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে থাকেন, দামি দামি উপহার তাকে দেন। তারপরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সন্তানটি ভালো মানুষ হতে পারছে না।


বতর্মান সময়ের মা-বাবারা ব্যস্ততার এ যুগে তাদের ক্যারিয়ার, স্ট্যাটাস ঠিক রাখতে গিয়ে সন্তানদের প্রয়োজনীয় সময়টুকু দিতে পারছে না।


এদিকে আমাদের অধিকাংশের একক পরিবার হওয়ায় দাদা-দাদী, চাচা-ফুফু বা মামা-খালা তাদের সাথে থাকছে না। তাই মমতা স্নেহ-ভালবাসা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে এবং সম্পর্কের বন্ধনের গুরুত্বটাও উপলব্ধি করতে পারছে না।


ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান নেই, আত্মীয় বা মেহমান বাসায় এলে দেখা করার সৌজন্যটুকু বোধ করার যে মানসিকতা-তা-ও গড়ে উঠছে না।


অনেক সময় আমরা বাচ্চাদেরে বকাঝকা করছি-অ্যাই, মিথ্যা বলা শিখলে কোথায়, গালি দিচ্ছো কেন? –আমি হয়তো তাকে মিথ্যা বলতে শেখাই নি, গালি শেখাই নি। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তারা আদব-নৈতিকতা শিখছে গৃহকর্মীর কাছ থেকে।


আপনার কর্মক্লান্ত দিনশেষে যখন ঘরে ফেরা হয়, ক্লান্তির-বিরক্তির সবটুকু ফল ভোগ করতে হচ্ছে সারাদিন ঘরে একা থাকা সন্তানটিকে। সে সারাদিনের অনেক কথা, অনেক আবদার জমিয়ে রেখেছিলো আপনার জন্যে। কিন্তু আপনি ব্যস্ত হয়ে গেলেন অন্যান্য বিষয় নিয়ে-যেটা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কাজ, কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা টিভি সিরিয়াল অথবা ফোনে অপ্রয়োজনীয় আলাপ।


টিভি সিরিয়ালের আসক্তি বিশেষত মাকে সন্তানদের থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এমন ঘটনাও ঘটেছে, সিরিয়াল দেখার জন্যে মা ছেলেকে অন্য ঘরে বন্ধ করে রেখেছেন, যাতে বিরক্ত না করে। আবার আপনি তাকে পাশে বসিয়ে সিরিয়াল দেখছেন আর ভাবছেন, পাশেই তো আছি। এতে কিন্তু সন্তান আপনার সাহচর্য পাচ্ছে না, টিভি-র সাহচর্য পাচ্ছে।


এরপর একসময় সে নিজেই ব্যস্ত হয়ে যায় টিভি, গেমস বা ফোন, ফেসবুকে এবং মা-বাবা বুঝে ওঠার আগেই সে আস্তে আস্তে অনেক দূরের মানুষ হয়ে যায়। জরিপে দেখা গেছে, মা-বাবার সাহচর্য বঞ্চিত শিশুদের প্রতি পাঁচজনে একজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে তার লেখাপড়ায়, আচার-আচরণে, ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং এরপর সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে।


অধিকাংশ মা-বাবা সময় দিতে না পারার ঘাটতিটুকু পূরণ করতে চান উপহার দিয়ে। সন্তানকে সন্তুষ্ট রাখতে আপনি তাকে প্রতিদিনই চকলেট, চিপস অথবা নিত্যনতুন উপহার দিচ্ছেন। অনেকে আবার দামি দোকানের দামি খাবার খাওয়ানোকে সন্তানের প্রতি স্নেহ-ভালবাসার প্রকাশ বলে মনে করেন।


এতে তার চাহিদা শুধু বাড়তেই থাকে। শুধু পেতেই সে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তার চাহিদা বাড়তে বাড়তে আজ স্মার্ট ফোন, কাল আই ফোন, পরশু অমুক তারপের তমুক। আসলে তার চাওয়ার তো শেষ নেই। যখন আপনি পেরে উঠবেন না, তখন আপনাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করবে। যখন ‘না’ শুনবে, তার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় যেটা তার জীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটা সময়পর সে বদরাগী, জেদি বা বিষণ্ণ হয়ে যায়।


সন্তান যখন আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না তখন আমরা বলি-এত কষ্ট করছি, এত পরিশ্রম করছি সবই তো ওদের সুখের জন্যে। এক মায়ের আক্ষেপ-যখন ও ছোট্ট, তখন থেকেই দিয়েছি, এখনো দিচ্ছি। অগুণতি জামা-কাপড় ছিলো, জুতোই ছিলো ২৫ জোড়া, দোকানের যত দামি খেলনা-সব কিনে দিয়েছি। যখন যা চেয়েছে, কখনো না করি নি। তাহলে কেন এমন হলো!


আমরা জানি, প্রতিটি মানবশিশু সুপ্ত মহামানবরূপে জন্মগ্রহণ করে। শত শত প্রতিশ্রুতিশীল তরুণের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, মা-বাবারা এদের বুঝতে ভুল করেছেন। একই মেজাজ-মর্জি বা একই টেম্পারমেন্টের বাচ্চা একদিকে যেমন অপরাধী বা সন্ত্রাসী হতে পারে, আবার খুব দক্ষ পাইলট বা এস্ট্রোনটও হতে পারে। নির্ভর করে আপনি কীভাবে এদেরকে হ্যান্ডল করতে পারেন। যে মা-বাবা সময় অনুযায়ী সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, সঠিকভাবে সন্তানকে গাইড করতে পারেন সে মা-বাবাই সফল মা-বাবা।


আসুন সন্তানকে সঠিকভাবে লালনে আমাদের দায়িত্ব এবং কতর্ব্য সম্পর্কে সচেতন হই:


আপনি সন্তানকে সব কিছুই দিয়েছেন, কিন্তু তার জন্যে সবচেয়ে জরুরি এবং প্রয়োজনীয় ‘সময়’ আর 'মনোযোগ' দেন নি। আপনার দেয়া দামি উপহারের প্রতি শিশুসন্তানের সাময়িক আকর্ষণ থাকতে পারে কিন্তু তার প্রয়োজন আপনার সাহচর্য, আপনার উপস্থিতি। আপনি ঘরে ফিরে তাকে একবার বুকে জড়িয়ে নিন। খোঁজ-খবর নিন, জানতে চান-সারাদিন তার কেমন কেটেছে। আপনার মমতার এই পরশ তাকে আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখবে আজীবন।


আপনি সন্তানের মমতাময় সঙ্গী হোন। আজকাল সন্তানরা যেভাবে মোবাইল বা ড্রাগ এডিক্ট হয়ে যাচ্ছে এর কারণ মাত্রাতিরিক্ত আদর, প্রচুর অর্থ, অসৎ সঙ্গ। সন্তান ছোট থেকে কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এটা দেখার দায়িত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই মা-বাবাদের। আদর আর দামি জিনিস দিলেই সন্তানের বন্ধু হওয়া যায় না।


অনেক মা-বাবা অভিযোগ করেন, ছেলেমেয়েরা কথা শোনে না। এজন্যে ছেলে-মেয়েদের চেয়ে মা-বাবাদের দায়িত্ব কোনো অংশে কম নয়। ছেলেমেয়েদের যে ভাষায় বলা উচিত সে ভাষায় আমরা বলতে পারি না। তাকে বোঝাতে হবে, উদ্বুদ্ধ করতে হবে।


সময়ের অভাবে অনেকসময় সন্তানদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব তৈরি হয় না। সন্তান অনেক কিছু শেয়ার করতে চায়। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিক্ষণে তার অনেক কথা, অনেক প্রশ্ন, অনেক অনুভূতি আপনাকে বলতে চায়। কিন্তু সময় দিতে না পারার কারণে আপনি তার বন্ধু হওয়ার সুযোগ হারালেন। এর ফলে সে বাইরের জগতে বন্ধু খঁজে নেবে এবং যখন সে মন খারাপের কারণে বাইরে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়, সেই বন্ধু কখনোই ভালো বন্ধু হয় না। এই বন্ধুদের হাত ধরেই সে হয়তো জড়িয়ে পড়ে অন্ধকার জগতের চোরাবালিতে যেখান থেকে ফিরে আসার পথ আর খুঁজে পায় না। এখান থেকেই শুরু হয় মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন অপরাধের হাতেখড়ি। মা-বাবারা যখন জানতে পারেন ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সন্তানের বন্ধু হোন। আপনার মনের দরজাটি তার জন্যে উন্মুক্ত করে দিন। সে যেন নিঃসংকোচে, নিঃসংশয়ে সব কথা আপনাকে বলতে পারে।


যখন সন্তানকে গড়ে তোলার সময় তখন আধুনিক মা-বাবা সন্তানকে খুব কম সময় দেন। সন্তান যখন বিগড়ে যায় তখন তাকে অনেক বেশি সময় দেয়া শুরু করেন, অনেক সময় চাকরিও ছেড়ে দেন। কিন্তু সন্তান তখন সময় চায় না। সে তখন তার জগতে ব্যস্ত হয়ে গেছে। কাদা বা মাটিকে নরম অবস্থায় আপনি যেভাবে খুশি সেভাবে আকার দিতে পারেন কিন্তু সেটা যখন শক্ত হয়ে যায় তখন তা ভেঙে যাবে। একটা বয়সের পরে সে নিয়ন্ত্রণ পছন্দ করবে না। সেই বয়স আসার আগে কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, কেন করা উচিত নয়-এই শিক্ষা তাকে দিতে হবে।


এখন বাচ্চারা মা-বাবার সাহচর্য না পেলেও কম্পিউটার বা টিভিকে পাচ্ছে অনায়াসে। আমরা কম্পিউটার, টিভির কাছে বাচ্চা রেখে কাজে যাই বা বাইরে যাই। কারণ আমরা জানি, টিভি বা কম্পিউটারের সামনে বসলে আর কোনো দুষ্টুমি করবে না, বিরক্ত করবে না। তাই এগুলো হয়ে গেছে বেবিসিটার। প্রযুক্তির এ যুগে আমরা টিভি বা কম্পিউটার থেকে বাচ্চাদেরকে একেবারে বঞ্চিত করতে পারবো না। কিন্তু আপনি মনিটরিং করতে পারবেন যদি তার ভালো বন্ধু হতে পারেন। আর নৈতিক শিক্ষায় তাকে শিক্ষিত করতে পারলে সে ভালোটাকে গ্রহণ এবং মন্দটাকে বর্জন করতে পারবে। আর এ নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকেই শিখতে হবে। এজন্যে আপনার সাহচর্যের কোনো বিকল্প নেই।


আমাদের মনে রাখতে হবে, বাসায় থাকা আর সময় দেয়া এক কথা নয়। এক ঘণ্টা সময়ও যদি পান, পরিপূর্ণভাবে সময়টুকু তাকে দিন। সন্তান যেন বোঝে এ সময়টুকু শুধুই তার। আপনি কতঘণ্টা সময় দিচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোয়ালিটি সময় দিচ্ছেন কি না। আজ যদি আপনি সময় না দেন, আপনার যখন প্রয়োজন হবে তখন তাদের কাছ থেকে কোন সময় আপনি পাবেন না।


সময় দিতে না পারার কারণে আমরা সন্তানকে প্রয়োজনীয় শাসনটুকু করতে পারি না। তার অজস্র অন্যায় আব্দার মেনে নিই। ভাবি, সময় দিতে পারি না, বাচ্চা এমনিতেই মন খারাপ করে থাকে। তাকে শাসন করি কী করে। এই সুযোগে বাচ্চা তার ইচ্ছামতো এবং মা-বাবার যাকিছু অপছন্দের বিষয় বা জিনিসগুলোও তার কাছ থেকে আদায় করে নেয়। আবার অনেক সময় মা-বাবা কিছু বলতে পারেন না কারণ একটাই ছেলে অথবা একটাই মেয়ে অথবা দুজন। শাসন করতে গেলে প্রতি মুহূর্তেই মনে হতে থাকে যদি কিছু হয়ে যায়, যদি কিছু করে বসে। শুধুই পেতে পেতে এই সন্তান স্বেচ্ছাচারী হয়, জেদি হয়, ভালো-মন্দ বুঝতে শেখে না। স্বার্থপর হয়ে বেড়ে ওঠে। তাই প্রয়োজনীয় শাসনটুকু করা থেকে আমরা যেন বিরত না হই। তবে শাসন করতে গিয়ে অত্যাচার করে ফেলবেন না।


শিশুর অনুসন্ধিৎসু মন অনেক কিছু জানতে চায়। একটি পাঁচ/ ছয় বছরের শিশুও প্রশ্ন করে, মানুষ মারা গেলে কী হয় ? আপনার সময় নেই, আপনি তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন। আপনি তাকে ভালো কিছু কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করলেন।


এই উত্তর সে হয়তো তার সহপাঠী বা অন্য কারো কাছে খুঁজবে। হতেই পারে সে সেখান থেকে ভুল শিক্ষাটা পাবে। তাই প্রশ্ন করলে থামিয়ে দেবেন না, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ধর্মের শাশ্বত সুন্দর কথাগুলো তাকে বলুন। সন্তানের মধ্যে আত্মিক মূল্যবোধ সঞ্চারিত হবে। আপনার সন্তানের মেধার বিকাশে, সফল জীবন গঠনে আপনার সহচর্যের কোনো বিকল্প নেই।


এখন অধিকাংশ মায়েদের অভিযোগ, বাচ্চা খেতে চায় না। আসলে সে বোঝে, খেতে না চাইলেই মাকে কিছুক্ষণ কাছে পাওয়া যাবে। আপনার মনোযোগ আকর্ষণের জন্যে তাই সে বিভিন্ন রকম বাহানা করে। ছয় মাসের বাচ্চাকে আপনি যখন খাওয়াচ্ছেন, একই সাথে আপনি হয়তো টিভি দেখছেন, পত্রিকা পড়ছেন, গল্প করছেন। এই বাচ্চটিও কিন্তু আপনার সবটুকু মনোযোগ দাবি করে। আপনি হয়তো ভাবছেন, যখন বাচ্চা বুঝতে শিখবে তখন সময় দেবো। দুই বছরের বাচ্চাকে পাশে বসিয়ে আমরা পরচর্চা করি, ভাবি-সে তো বুঝতে পারছে না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশু বুঝতে শুরু করে একবারে ভ্রূণ অবস্থা থেকে।


সবকিছুর পরে যে কথাটি আমরা খুব গুরুত্বের সাথে বলতে চাই, পরিবারে কোয়ালিটি সময় দেয়ার জন্যে প্রয়োজন আপনার মানসিক প্রশান্তি, কাজে সুবিন্যাসায়ন। আর এজন্যে প্রয়োজন মেডিটেশন। নিয়মিত মেডিটেশনে আপনার কাজে ভারসাম্য আসবে, রাগ ক্ষোভ দূর হবে, মমতা বাড়বে। মমতার শক্তিই এমন, যা দিয়ে সবকিছুকে জয় করা যায়।