বয়ঃসন্ধি কাল প্রয়োজনীয় টুলস শিশুকে বুঝতে হবে

ওকে বুঝে তবে বোঝান

‘কে আমার বন্ধু হবে, কোচিংয়ে কার পাশে বসব—এসব মা-ই ঠিক করে দিতে চান৷ স্কুল-কোচিং সব জায়গায় আমার সঙ্গে যেতে চান৷ বাইরে বসে থাকেন৷ একদিন মা কোচিংয়ের ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে লক্ষ করলেন, আমি একটি মেয়ের পেছনের বেঞ্চে পর পর দুদিন বসেছি৷ বাড়িতে ফিরে মা বলেছিলেন, এরপর থেকে মেয়েটির কাছাকাছি বসা যাবে না৷ বসলে কোচিংয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেবেন৷ আপনিই বলুন, এসব কার ভালো লাগে?’ এ কথাগুলো আমাকে বলেছিল নবম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী৷ তার কথায় খুব বিরক্তি ও রাগের অনুভূতি স্পষ্ট ছিল৷ বয়ঃসন্ধিকালে (১০-১৯ বছর) থাকা আরেকটি মেয়েকে কাউন্সেলিং-সেবা দেওয়ার একপর্যায়ে আমি বলেছিলাম, প্রতিদিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনায় তার কী ধরনের অনুভূতি বা আবেগ তৈরি হয় এবং সেই আবেগের সঙ্গে মনে কী কী ভাবনা তৈরি হয়, তার বর্ণনা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটি নোটবুকে লিখতে৷ এর দ্বারা তার নেতিবাচক ভাবনাগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাকে সাইকোথেরাপির সহায়তা দিতে চেয়েছিলাম৷ মেয়েটি তখন অভিযোগ করেছিল, মা তার গোপনীয়তার প্রতি একেবারেই শ্রদ্ধাশীল নন৷ সে যেদিন বুঝতে পারল, তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে লেখা ডায়েরিটি মা লুকিয়ে পড়েছেন, তখন সে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেছে এবং রাগ করে এর পর থেকে ডায়েরি লেখাই বন্ধ করে দিয়েছে৷

অনেক দিন আগে ১৪ বছরের ছেলের আচরণগত সমস্যা সম্পর্কে বলতে মা-বাবা দুজনেই এসেছিলেন৷ তাঁদের মতে, ছেলেটি যেভাবে চুল বড় করেছে এবং বিশেষ স্টাইলে কাটছে, তা তাঁদের একেবারেই পছন্দ নয়৷ এ ছাড়া সে কোমরের নিচে ট্রাউজার পরছে, সেটি পায়ের কাছে মাটিতে গড়াচ্ছে৷ ট্রাউজারের ডিজাইনও তাঁদের কাছে দৃষ্টিকটু লাগছে৷ ছেলেকে এসব ব্যাপারে নিরস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে বাবা ওর বেশ কয়েকটি ট্রাউজার কাঁচি দিয়ে কেটে দিয়েছে৷ ছেলেটি সেটি দেখার পর বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙচুর করে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়েছে৷

একজন অসহায় বাবা বলেছিলেন, তাঁর কন্যাসন্তানটি দিন-রাত একটি ছেলের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলত৷ তাকে কোনোভাবেই থামাতে না পেরে ফোনটি তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং মেয়েটির বাইরে যাতায়াতও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার ছেলেবন্ধুটি চারতলার বারান্দা থেকে ঝোলানো দড়িতে বেঁধে একটি মুঠোফোন দিয়েছিল৷ সেটির সাহায্যে ছেলেটির সঙ্গে যোগাযোগ করে মেয়েটি বাড়ি থেকে পালিয়েছিল৷
১২ বছর বয়সের একটি ছেলে মোটেও আগ্রহী ছিল না কাউন্সেলরের কাছে এসে কথা বলতে৷ তার মা-বাবা অনেক বুঝিয়ে তাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিলেন৷ সে সেদিন অনেকক্ষণ একা আমার সঙ্গে কথা বলেছিল এবং বাড়ি ফেরার পর অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় চমৎকার একটি বার্তা পাঠিয়েছিল৷ তার সারমর্ম ছিল, জীবনে সে এই প্রথম কারও কাছে মনের কথাগুলো বলতে পেরে অত্যন্ত স্বস্তি বোধ করেছে৷

এ রকম অসংখ্য ঘটনা আমরা যারা মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং-সেবা দিচ্ছি, তাদের প্রতিনিয়তই শুনতে হয়৷ অনেকেই ভাবতে পারেন, এই বয়সের সন্তানদের সমস্যাগুলো কি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গিয়েছে? এর উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলা যায়৷ কারণ, এই যুগে প্রজন্মের ব্যবধান বিশাল আকার ধারণ করেছে৷ ভালো-মন্দ তথ্যের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বহীন ব্যবহার এই ব্যবধান দিনে দিনে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে৷ যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার সৃষ্টি হয়েছে৷ ভাইবোনের সংখ্যা আগের তুলনায় কম হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্কের ধরনগুলো বদলে গিয়েছে৷ একটি মেয়ে আমাকে বলেছিল, তাদের বাড়ির চারটি মানুষ মনে হয় চারটি আলাদা দ্বীপের বাসিন্দা৷ দেখা যাচ্ছে, শৈশব থেকে বয়ঃসন্ধির আগ পর্যন্ত মা-বাবারা সন্তানদের অত্যন্ত নির্ভরশীল করে বড় করছেন বলে তাঁদের জীবনদক্ষতা ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে না৷ হঠাৎ করেই বয়ঃসন্ধিতে এসে তাদের যখন দায়িত্বশীল হতে বলা হচ্ছে, তখন তারা বুঝতে পারছে না মা-বাবা আসলে কী চাইছেন৷ এ ছাড়া শৈশবে তাদের আবদারগুলো অনেক সময় সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে মেটানোর ফলে সন্তানদের প্রত্যাশা এত বেড়ে যাচ্ছে যে পরবর্তী সময়ে অভিভাবকেরাও বুঝতে পারছেন না, তাঁরা এখন কী করবেন৷ এই বয়সে এসে সন্তান যখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য স্বাধীনতা চাইছে, নিজের পছন্দমতো বন্ধু বানাতে চাইছে, তখন মা-বাবা বাধা দিতে চেষ্টা করলেই শুরু হচ্ছে গৃহযুদ্ধ৷

অভিভাবকেরা কষ্ট পেতে থাকেন এই ভেবে যে তাঁদের চিরচেনা লক্ষ্মী সন্তানটি যেন হঠাৎ বদলে গেছে৷ আর শরীর ও মনের দিক থেকে বদলে যাওয়া সন্তানটি ভাবছে, মা-বাবা কেন তার সঙ্গে এতটা নিষ্ঠুর হচ্ছেন, কেন তার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না? এখন তো আর সে ছোট নেই৷ শৈশবে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মা-বাবার সব কথা শুনেছে, কিন্তু এখন তো তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বেশি ভালো লাগছে, মা-বাবার কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রতি তাই তার বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করছে৷

বয়ঃসন্ধিতে এসে যাতে সন্তান ও অভিভাবকদের অতিরিক্ত মতানৈক্য সৃষ্টি হওয়ার ফলে দূরত্ব তৈরি না হয়, সেই লক্ষ্যে মা-বাবাকেই সবচেয়ে বেশি সচেষ্ট হতে হবে৷ এ ছাড়া বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কমিউনিটির বাসিন্দাদেরও তাদের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে৷ অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই বয়সে তাদের আবেগ আর মনোভাবগুলো বুঝে সেভাবে আচরণ করা প্রয়োজন৷
প্রথমে আমি অভিভাবকদের করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরতে চাই৷ নিজেকে একজন রোল মডেল হিসেবে এমনভাবে উপস্থাপন করুন, যাতে করে সন্তান আপনাকে দেখে সঠিক আচরণগুলো শিখতে পারে৷ অর্থাৎ, ‘ডু হোয়াট আই সে’ নয়, ‘ডু হোয়াট আই ডু’-তে বিশ্বাস করুন৷
এই বয়সে সন্তানদের মধ্যে দায়িত্ববোধ কতটা তৈরি হয়েছে, তা লক্ষ করুন৷ যদি সেটির ঘাটতি থাকে, তাহলে বুঝতে হবে শৈশব থেকে তাকে আপনি ছোট ছোট দায়িত্ব নিতে শেখাননি বলে এটা ঘটেছে৷ নিজের কাঁধে সেটির দায়িত্ব নিয়ে সন্তানকে এই বোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করুন৷ যদি মনে হয়, সে তার নিজের ও অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল হচ্ছে, তাহলে কিছুটা স্বাধীনতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করুন৷

এই বয়সে আবেগের আধিক্য থাকে বলে সন্তানের মতামতের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল হোন৷ জোর করে নিজের সিদ্ধান্তটি তার ওপরে চাপিয়ে না দিয়ে কিছু বিকল্প পথ এবং এর সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে, তা সুন্দরভাবে সন্তানের সামনে তুলে ধরুন৷ তাকেও যে নিজের সিদ্ধান্তের ফলাফলের দায়িত্ব নিতে হবে, সে বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন৷ যদি সে দায়িত্বশীল হয়ে স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করে এবং সততা ও নৈতিকতা পরিচয় দেয়, তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে প্রশংসা করে উৎসাহিত করুন৷ তাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভালো করে ভেবে দেবেন, যাতে পরবর্তী সময়ে তা ভঙ্গ করতে না হয়৷ যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে আপনি সেটি দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে সেটির পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিন৷ কখনো তার সঙ্গে অন্য কারও তুলনা করবেন না৷
সন্তানের জানার আগ্রহকে গুরুত্ব দিন৷ এ সময় শারীরিক পরিবর্তনগুলো খুব দ্রুত হয় বলে তারা বেশ বিভ্রান্তিতে থাকে৷ ছেলেসন্তানের বাবা এবং মেয়েসন্তানের মায়েরা বিজ্ঞানসম্মত তথ্যগুলো সংকোচ কাটিয়ে সুস্থভাবে ওদের দিতে থাকুন৷ যদি মা-বাবা এসব বিষয়ে অতটা সমৃদ্ধ না থাকেন, তাহলে এ-সম্পর্কিত সঠিক তথ্যসংবলিত বইপত্র দিয়ে সন্তানকে সহায়তা করুন৷ এ ছাড়া ওদের অনুভূতির সঙ্গেও একাত্মতা প্রকাশ করে ওদের সঙ্গে বন্ধন দৃঢ় করুন৷

মুঠোফোন, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার ও টেলিভিশন ব্যবহারের ব্যাপারে তার সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সময়মীমা নির্ধারণ করে দিন৷ তার কাছে আপনি কী প্রত্যাশা করেন এবং সে যে প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে সক্ষম, এই বিষয়ের ওপরে জোর দিন৷ নিজেরাও প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে সন্তানের সঙ্গে কার্যকর সময় কাটান৷ অন্তত রাতের খাবারটি যাতে সবাই একসঙ্গে বসে খেতে পারেন এবং সারা দিন কী কী হলো, তা যাতে আলোচনা করতে পারেন, সে বিষয় নিশ্চিত করুন৷

কখনো লুকিয়ে সন্তানের ব্যক্তিগত জিনিস ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না৷ ড্রাইভার, বাড়ির কাজে সহায়তাকারী বা বন্ধুবান্ধব ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে আপনার সন্তান সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করার চেষ্টা করবেন না৷ এতে করে তারা আপনার ওপর শ্রদ্ধা আর আস্থা একেবারেই হারিয়ে ফেলবে৷ তবে ওপরের বিষয়গুলোয় সফল হওয়া তখনই সম্ভব হবে, যখন সন্তানের সঙ্গে আপনি গভীর বিশ্বাস, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরি করতে ওর শৈশবকাল থেকেই সচেষ্টা থাকবেন৷

ওর আবেগপ্রবণ বা মানসিক চাহিদাগুলো না মিটিয়ে অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ নিলে তা কখনোই কার্যকর হবে না৷ কঠিন শাস্তি দিয়ে এই বয়সে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হবে৷ এতে স্বাধীন চিন্তাগুলো বিঘ্নিত হবে এবং বড়দের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধনও তৈরি হবে না৷ সে বিষণতায় ভুগে নিজের ও অন্যদের জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত করবে৷
বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়গুলোয় কিছু শিক্ষককে অবিলম্বে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিংয়ের ওপর মৌলিক কিছু কৌশলের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত প্রয়োজন৷ এই শিক্ষকেরা কিছুদিন পর পর অভিভাবকদের এবং অন্য শিক্ষকদের নিয়ে কর্মশালার ব্যবস্থা করলে সবার মধ্যেই যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হবে৷ মাঝেমধ্যে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদ্যালয়ে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে৷

আমাদের দেশের কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে শুধু বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো হয়৷ এগুলোয় আবার বাসিন্দাদের উপকারে আসে, সে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করা প্রয়োজন৷ এতে করে আমাদের তরুণ সমাজের আবার আগের মতো বই পড়ে, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে, খেলাধুলা করে সুস্থ জীবনধারায় ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে৷

লেখক: অধ্যাপক, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়৷