বয়ঃসন্ধি কাল তথ্যসমূহ এসময়ের মানসিক সমস্যা

কিশোর-কিশোরীর বিভিন্ন মনোসমস্যা ও বিষণ্নতা.

কিশোর-কিশোরী দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার শিকার। দীর্ঘমেয়াদি রোগ মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যাপারটি সাময়িক নয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীরা বুঝতে পারে এ রোগ তাদের সহজে ছাড়বে না, এ ভাবনার ফলে মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা আরো খারাপ আকার ধারণ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত তারা প্রথমে স্বীকার করতে চায় না যে তারা অসুস্থ। পরবর্তীকালে যখন এ ব্যাপারটা মেনে নিতে হয় তখন কিশোর-কিশোরী হয়ে ওঠে-
•    রাগী
•    উত্তেজিত
•    হতাশ
কিশোর বয়সীরা দ্বৈত ব্যবহার করে থাকে। একদিকে শারীরিক সমস্যার জন্য তারা মা-বাবা ও ডাক্তারের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আরেকদিকে তাদের মধ্যে স্বাধীন চেতনাবোধ কাজ করে, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিভিন্নভাবে মিশতে চেষ্টা করে। কিশোর-কিশোরী যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত তারা অনেক সময় ওষুধ নিয়মিত খায় না বা কম খায়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগ লেখাপড়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ সময় ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে চায় না, ফলে একাকিত্ব বাড়ে, নিজেকে অপরের চেয়ে অন্যরকম মনে করে। এ সময় বাবা-মায়ের উচিত হবে তার সন্তানকে শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় বা হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে তারা নতুন কিছু শিখে নিতে পারে। বিদেশী ভাষা চর্চা করতে পারে। এগুলো তাকে মানসিকভাবে সচল থাকার জন্য সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করবে। প্রতিটি মা-বাবারই উচিত তার এই দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত সন্তানকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া, তার যত্ন নেয়া, তাকে আশ্বস্ত করা, তার প্রতি মায়া-মমতা, স্নেহ প্রকাশ করা এবং তার মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করা। এ সময় তাদের কোনো রকম মনে কষ্ট সৃষ্টিকারী কথা বলা যাবে না, অযথা ধমকানো ঠিক হবে না, তার রোগের জন্য তাকে দোষারোপ করা যাবে না।
 
কিশোর-কিশোরীদের মাঝে প্রায়ই উত্তেজিত অবস্থা দেখা যায়। বাবা-মা প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন আমার সন্তানটি হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে যায়, জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। উত্তেজিত ব্যবহার এতটা হয় যে, তারা ভীষণভাবে রাগী হয়ে যায়। শারীরিক উগ্রতা প্রকাশ করে, মারামারি করে এমনকি কোনো কোনো ছেলেমেয়ে নিজের ক্ষতি করে ফেলে, আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করে থাকে। কিশোর-কিশোরীদের এ রকম উত্তেজিত ব্যবহার বা আচরণের জন্য একটি কারণই দায়ী নয়, একাধিক কারণ যুক্ত থাকতে পারে যেমন-
 
•    যদি বাড়িতে বেশি ভায়োলেন্স থাকে
•    সমাজে যদি ভায়োলেন্স বেশি থাকে
•    ভায়োলেন্সপূর্ণ মুভি, সিনেমা বেশি পরিমাণে টিভিতে, কম্পিউটারে দেখা
•    ভায়োলেন্সপূর্ণ অত্যধিক গেম খেলা
•    পূর্বের রাগান্বিত ব্যবহার বা উত্তেজিত ব্যবহার
•    শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়ে থাকলে
•    যদি সে যৌনভাবে নির্যাতিত হয়ে থাকে
•    বংশানুক্রমিক রাগ যদি বেশি থাকে
•    ড্রাগ বা মদে আসক্ততা থাকলে
•    বাড়িতে যদি মানসিক চাপ বেশি থাকে
•    মস্তিষেক যদি আঘাত থাকে
•    যদি বড় ধরনের কোনো মানসিক রোগ থাকে
•    কিশোর-কিশোরীর আচরণগত সমস্যা একটি জটিল সমস্যা। কিশোর-কিশোরীরা এ সময় নীতিগত কোনো বাধা বা সামাজিক কোনো আচরণবিধি মেনে চলে না বা মেনে চলতে চায় না। এদেরকে প্রায়ই বদমাস, দুষ্ট বা বেয়াদব ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। এগুলো ঠিক নয়। কিশোর-কিশোরীরা আচরণগত সমস্যায় আক্রান্ত হলে তাদের আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। এ সময় দেখা দেয় বিভিন্ন উপসর্গ
•    মিথ্যা কথা বলা বা গালিগালাজ করা
•    বড়দের সাথে খারাপ ব্যবহার করা, বড়দের সমমান না করা
•    ছোটদের স্নেহ-মমতা না করা, মারধর করা
•    জীবজন্তু বা পশুপাখির সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করা
•    অন্যের জিনিস না বলে নেয়া, চুরি করা
•    সেক্সের প্রতি অত্যধিক উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠা, যৌনতায় উগ্র হয়ে ওঠা
•    ঘরের দামি জিনিসপত্র ভাঙচুর করা, কোনো কিছুতে আগুন লাগিয়ে দেয়া
•    সামাজিক রীতি-নীতি না মানা, ভঙ্গ করা
•    উচ্ছৃঙ্খলভাবে চলা
•    অস্ত্রের দ্বারা হুমকি দেয়া ইত্যাদি
 
 
অনেক কিশোর-কিশোরী অনেক সময় নিজ স্বার্থে মিথ্যা কথা বলে থাকে দায়িত্ব এড়ানোর জন্য। মা-বাবার উচিত সন্তানদের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলা এবং তাদের সততার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জ্ঞানদান করা। অনেক সময় কিশোর-কিশোরী মনে করে মিথ্যা বলা খারাপ নয়। যখন সে তার বন্ধুদের মনে আঘাত দিতে চায় না তখন মিথ্যা বলে। আবার কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষায় ও মা-বাবার মনে আঘাত না দিতে চাওয়ার জন্যও মিথ্যা বলে থাকে। যেমন রাত করে বাড়ি ফিরে মিথ্যা কথা বলে, আবেগগত সমস্যার জন্য তারা মিথ্যা বলে থাকে, যদিও তারা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য জানে। তবুও বিশ্বাসযোগ্য করে, মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য তারা মিথ্যা কথা বলে অনেক সময়। অনেকে আবার সারাক্ষণ মিথ্যা কথা বলতে থাকে।
কিশোর-কিশোরীরা সত্য ও মিথ্যা বলাটা সাধারণত বাড়িতেই রপ্ত করে থাকে। প্রথম প্রথম মা-বাবা ছেলেমেয়েদের মিথ্যা কথা বলা সম্পর্কে খুব একটা আমলে আনেন না বা গ্রাহ্য করেন না। তারা মনে করেন যে, মিথ্যা কথা বলাটা একটা বয়স পর্যন্ত মারাত্মক কোনো সমস্যা নয়। এটা ঠিক নয়। তবে ৩-৫ বছর বয়স পর্যন্ত বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলা বা মিথ্যা বলা স্বাভাবিক। কারণ তাতে এরা মজা পায়, অন্যরা বাহবা দেয়, তবে পরবর্তীকালে এই অভ্যাস ত্যাগ করা অনেকের বেলাতেই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বাস্তব ও কল্পনার মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে তাদের কষ্ট হয়।
 
মা-বাবা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বন্ধু-বান্ধবদের চাহিদা মেটাতে কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় মিথ্যা কথা বলে। এটি তারা ইচ্ছা করে বলে তা নয়, কিছুটা বাধ্য হয়ে বলে, তবে এ রকম ইচ্ছা-অনিচ্ছা, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ছোট কিংবা বড় মিথ্যা বলার প্রবণতা তৈরি করে। এসব পরিস্থিতিতে মা-বাবার যা করা প্রয়োজন তা হলো-
 
•    বাড়িতে এবং সমাজে সততার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলতে হবে
•    কিশোর-কিশোরীদের সাথে যা যা বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করা
•    বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝিয়ে দিতে হবে
•    মিথ্যার বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। এত কিছুর পরও যদি মিথ্যা বলার ধরন হয় মাত্রাতিরিক্ত, ক্ষতিকর ও বারবার ঘটে তাহলে মনোচিকিৎসকের সাহায্য নেয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে যে, শতকরা ২০ ভাগেরও অধিক তরুণ-তরুণীর ইমোশনাল ডিসঅর্ডার বা আবেগের সমস্যা রয়েছে এবং এদের দ্বারা আত্মহত্যার মতো কঠিন কিছু ঘটে যেতে পারে। তরুণ-তরুণী ছেলেমেয়েদের আত্মহত্যার প্রবণতা থাকলেই যে বিষণ্নতা থাকবে তা নয়, তবে বিষণ্নতা থাকলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বেশির ভাগ আত্মহত্যা ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয় যে ফ্যাক্টরগুলো, সেগুলো হলো-
•    পারিবারিক দ্বন্দ্ব
•    বাবা-মায়ের মধ্যে অবনিবনা, নিত্য ঝগড়া
•    সঙ্গীর সাথে ঝগড়া
•    যৌনতার অপব্যবহার এবং
•    বিচ্ছেদ ইত্যাদি
 
কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের মানসিক সমস্যা দেখা দিতেই পারে, তার জন্য তাদের অযথা বকাঝকা করলে চলবে না বরং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন, তাদের সান্ত্বনা দিন, ভালোবাসা দিন এবং একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।
 
 
বিপথগামী ছেলেমেয়ে
শৈশবে বাবা-মা, পরিবারের গুরুজনদের নিয়ম-কানুনের যে বাঁধন থাকে তা কৈশোরে অনেকখানি শিথিল হয়ে পড়ে। কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালে দেহ ও মনে অনেকখানি পরিবর্তন ঘটে। তারা নিজেদের শরীরের পরিবর্তন যেমন বুঝতে পারে, তেমনি মানসিকতাও তাদের পাল্টাতে থাকে। এই সময়ে বাবা-মা বা পরিবারের অন্যদের সঙ্গ অনেক সময়েই ভালো লাগে না। শাসনের গণ্ডির বাইরের জগৎ হাতছানি দেয়। একদিকে লাগামছাড়া গতি, স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ এবং বয়সে যারা বড় তাদের প্রতি উপেক্ষা বা অবজ্ঞার মনোভাব এবং অপরদিকে অজানাকে জানার আগ্রহ। নতুন কিছু করার নেশা তাদের মনকে আচ্ছন্ন করে। তাদের তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্বও প্রচণ্ড উত্তেজনার বশবর্তী করে তোলে। এ সময়ে যদি তাদের মানসিক গঠন ও বিকাশ সুস্থ ও সুন্দর না হয় তবে তাদের পক্ষে বয়ঃসন্ধিকালের সংকটপূর্ণ মুহূর্তগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। ফলে শৈশবের ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে কৈশোরে উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী হয়ে নানা রকম অসামাজিক এবং বিধিবহির্ভূত কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে রাখা দরকার, সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের তুলনায় কোনো কোনো জড়বুদ্ধি অথবা পিছিয়ে পড়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আচরণসংক্রান্ত ত্রুটি, অসামাজিক কাজের ওপর ঝোঁক বেশি দেখা যায়।
 
বিপথগামী কিশোর-কিশোরী আজকের দিনে এক মারাত্মক সমস্যা। এখনকার গতিশীল আধুনিক জীবনযাত্রায় পণ্য মানসিকতা ও পশ্চিমী চিন্তাভাবনার প্রভাব, পারিবারিক জীবনের আত্মীয়তার টানের অভাব এই সমস্যাকে বড় প্রকট করে তুলেছে। কৈশোরে কিছু ছেলেমেয়ে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে এবং দেখা যায় তাদের আচার-আচরণে সামাজিক রীতিনীতি না মেনে চলার ঝোঁক বেশি, অনেক কিশোর-কিশোরী বাড়িতে এবং বাইরে অবাধ্য হয়ে ওঠে। বড়দের কথা শুনতে বা মেনে চলতে চায় না। ছোট-বড় অপরাধ ঘটিয়ে থাকে।
 
অপরাধপ্রবণতার প্রভাবে কিশোর-কিশোরীদের আচরণে বিভিন্ন রকম মন্দ লক্ষণ দেখা যায়, এগুলো হলো-
 
•    অস্বাভাবিক দুরন্তপনা
•    অবাধ্যতা
•    রাগ করা
•    বাবা-মা ও গুরুজনদের কথা না শোনা
•    নিজের ভালো-মন্দ উপেক্ষা করা
•    গালিগালাজ করা
•    সবার সঙ্গে অশ্লীল ভাষায় কথা বলা
•    মন্দ কাজ করে কোনো অনুশোচনা না করা
•    বাড়ির জিনিসপত্র নষ্ট করা
•    চুরি করা
•    ছিনতাই করা, রাহাজানি করা
•    দলবেঁধে হৈ হুল্লোড় করা
•    মারামারি করা
•    ঝগড়াঝাঁটি করা
•    জেনেশুনে আগুন লাগানো
•    কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলবেঁধে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা
•    সমবয়সী মেয়েদের টিটকারি করা
•    মেয়েদের ভয় দেখিয়ে বশে আনার চেষ্টা করা
•    না বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া
•    স্কুলে না যাওয়া
•    স্কুল থেকে পালিয়ে যাওয়া
•    নেশা করা
•    লোক ঠকানো
•    ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করা ইত্যাদি
 
মানসিক গঠন ও বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, বাবা-মা ও পরিবারের অন্যান্য ছেলেমেয়ের সুস্থ মনের অধিকারী হতে সাহায্য  করে। জন্মগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কিছু ভূমিকা থাকলেও সুস্থ পরিবেশ ব্যতীত সুস্থ মন গঠন সম্ভব নয়। মা ও বাবার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রতিফলিত হয়ে থাকে।
 
সামাজিক পরিবেশ অনেক সময়ে কিশোর-কিশোরীদের অপরাধপ্রবণ ও বিকৃতমনা করে থাকে। বাড়িতে শান্তি নেই, ছেলেমেয়েরা বাইরের বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মেশে, এ সময়ে অনেকে বয়স্ক ও স্বভাব অপরাধীদের সংসপর্শে আসে ও অপরাধের কায়দাকানুন শেখে। খুব সহজেই তারা লোভী হয়ে পড়ে ও সহজ উপায়ে অর্থ উপার্জনের নেশায় বিভোর হয়ে পড়ে।
 
প্রতিষ্ঠাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক সময়ে কিশোর-কিশোরীদের দুষিক্রয়তার অন্যতম কারণ।
 
•    দামি-জামাকাপড়
•    সাজসজ্জা
•    রেস্টুরেন্টে খাওয়া
•    দামি মদ-সিগারেট খাওয়াকে অনেক কিশোর-কিশোরী স্ট্যাটাস বলে মনে করে থাকে। ফুর্তি, আমোদ-প্রমোদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বাড়ি থেকে অনেক সময় পাওয়া যায় না, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে ‘পদমর্যাদা’ বাড়ানোর জন্য অনেকে অসামাজিক উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে কিশোর অপরাধীদের বাবা-মা অথবা পরিবারের অন্যরা প্রচ্ছন্নভাবে তাদের দুষকর্মের প্রশ্রয় দিয়ে থাকে, এসব ছেলেমেয়েও অল্প বয়সে অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে। বাবা-মার মধ্যে
•    ঝগড়াঝাঁটি
•    বাড়িতে অশান্তি
•    স্নেহের অভাব
•    নিরাপত্তার অভাব কিশোর-কিশোরীদের বিপথগামী করে থাকে।
 
এখনকার দিনের শোচনীয় আর্থিক বিপর্যয় আমাদের সমাজজীবনকে পঙ্গু করে ফেলছে। সংসারের অভাব-অনটন মানসিক দ্বন্দ্ব-হতাশার সৃষ্টি করছে। ছেলেমেয়েরা অনেক সময় বিদ্রোহী হয়ে পড়ে। আর্থিক দুরবস্থার জন্য অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও লেখাপড়া করতে পারে না অনেক কিশোর-কিশোরী। নিজেদের সুখ-আহলাদের চাহিদা মেটানোর জন্য অসামাজিক কাজকর্মের দিকে তারা ঝুঁকে পড়ে।
 
অবস্থার পাপচক্রের শিকার এসব বিপথগামী ছেলেমেয়েকে শাস্তি দিয়ে ভালো করার চেষ্টায় যেটুকু সুফল পাওয়া যায় তাদের মনের নাগাল পেলে অনেক বেশি সুফল পাওয়া যায়। এজন্য বাবা-মা অথবা পরিবারের অন্যান্য সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
 
রাকীবের বয়স ৫২ বছর, মাঝারি গড়ন, রঙ ময়লা, মাথাভর্তি টাক, আনাচে-কানাচে চুল, বিবাহিত, তিন ছেলে, দুই মেয়ে। বড় ছেলে পার্ট ওয়ান (বি-এ) ফেল। এখন একটা লেদ মেশিনের কারখানায় কাজ শিখছে। মেজ ছেলেটি হায়ার সেকেন্ডারি টেনেটুনে পাস করেছে। আর পড়ায় মন নেই। শুধু খেলাধুলা নিয়ে থাকে। ওদের দুজনেরই সংসারের কোনো ব্যাপারে ভাবার সময় নেই। রাতে শোয়া আর দু বেলা খাওয়া ছাড়া বাড়ির সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক নেই। দুই মেয়ের মধ্যে বড়টির বয়স একুশ বছর, ছোট মেয়েটির উনিশ। দুজনেই ক্লাস সেভেন এইটে বার কয়েক হোঁচট খেয়ে এখন মায়ের সঙ্গে ঘরকন্নার কাজ শিখছে। বাবাও বেঁচে গেছেন, স্কুলের মাইনে গোনার থেকে রেহাই মিলেছে। রবি রাকীবের ছোট ছেলে, বয়স সতেরো। ওর জন্যই যত জ্বালা, ওকে নিয়েই যত ভোগান্তি, কাউকে কেয়ার করে না, ইচ্ছামাফিক চলে, গোঁয়ার্তুমি করে, সিগারেট খায়, উল্টাপাল্টা পথে টাকা খরচ করে। এই ছেলেকে নিয়ে বাবা মনোচিকিৎসকের কাছে যান। মনোচিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে তার সব কথা শুনে তাকে কয়েক সেশন সাইকোথেরাপি দেন। কিছু দিন পর থেকে ছেলেটির আচরণে লাগাম আসতে শুরু করে। ছেলেটি এখন ঠিকমতো লেখাপড়া করে, সে এখন আগের থেকে অনেক ভালো আছে।
 
 
মানুষের জীবনে বিষণ্নতা
মানুষের জীবনের শুরু কান্না দিয়ে। জন্মেই যদি শিশু না কেঁদে ওঠে তাহলে হয় চিন্তার কারণ, অর্থাৎ তখন কান্নাটাই স্বাভাবিক। এই কান্নাকে বলা যায় মনের বিষণ্নতা ভাব প্রকাশের একটি বিশেষ ভঙ্গি। কিন্তু কেনইবা কান্না আর কেনইবা বিষণ্নতা? তখন পৃথিবী সম্বন্ধে অভিজ্ঞতার ঝুলি তো প্রায় শূন্য। আর ওই ঝুলিতেই ভরে থাকে সারাজীবনের হাসি ও কান্নার নানা রঙের কারণগুলো। তাহলে এখন জন্মেই কেন কান্না? শিশুর মনের তখনকার অবস্থা এভাবে ভাবা যেতে পারে, এতদিনের একটা অভ্যস্ত অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ নতুন অবস্থায় আসার ফলে শরীরে অস্বস্তি, আর সেই অস্বস্তি প্রকাশের ভাষা তো তখনও রপ্ত হয়নি। তাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কান্নার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় শিশুর অসহায় ভাব ও প্রতিবাদ। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য জীবনের ওই ধরনের সেপারেশন অ্যাংজাইটির অভিজ্ঞতা। আবার নিজের ওপর নির্ভরতারও প্রথম অভিজ্ঞতা কারণ সব রকম শারীরিক প্রক্রিয়া সদ্যোজাতকে নিজেকে করতে হয়। জন্ম মানেই ঝুলির মধ্যে জীবনের অভিজ্ঞতার প্রথম সঞ্চয়, জন্মানোর জন্য মানসিক আঘাত বা Birth trauma প্রথম অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণ। কিন্তু তখন পৃথিবীর আলো যেন এক অদ্ভুত আঁধার, অচেনা, অজানা, অবোধগম্য। এর সঙ্গে মনের যেসব অবস্থা ?%I6?ড়িত তাকে কখনো বলি-
 
•    আশঙ্কা
•    কখনো হতাশা
•    কখনো উদ্বিগ্নতা
•    কখনোবা বিষণ্নতা
 
বিষণ্নভাব মনের একটা বিশেষ ধরনের অবস্থা যার সঙ্গে মানুষের প্রথম পরিচয় জন্মানোর পরই। একটি হঠাৎ আলোর ঝলকানি সব কিছু ওলটপালট।  কোথায় গেল এতদিনের সেই অভেদ্য নিরাপত্তা, নিশ্চিন্ত নির্ভরতা। মনের বিষণ্ন ভাবের সঙ্গে এই যে প্রথম দেখা তার শেষ নেই।
 
বিষণ্ন ভাব ও বিষণ্নতা এক নয়। বিষণ্নতা মানসিক রোগ, যা বেশিমাত্রার বিষণ্ন ভাবের ফলে হতে পারে। তাই বলে বিষণ্ন ভাবের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। বিষণ্ন ভাবের পরিমাণ বেশি হওয়ার ফলে কারোর প্রাত্যহিক জীবনযাপনে যদি অসুবিধা হয় এবং মনের অসুখ সারানোর বিশেষজ্ঞের সাহায্য না নিয়ে যদি তাকে লাগামছাড়াভাবে বেড়ে যেতে দেয়া হয়, তাহলে তার পরিণতিতে একজন বিষণ্নতা রোগের শিকার হতে পারে। তাই বিষণ্নতার মূল কারণ জানানোর জন্য খুঁজে বের করা দরকার কোথায় মনের বিষণ্নতা ভাবের উৎস।
 
মন খারাপ হওয়ার বা বিষণ্ন হওয়ার কারণগুলোকে সাধারণত ২ ভাগে ভাগ করা যায়। কতগুলো কারণ আছে যা নিজের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন-
 
•    যা চাইছি তা না পেলে
•    কিংবা যেমনভাবে চাইছি তেমনভাবে না পেলে।
 
আবার মনের ধরন হয়তো এমন যেসব ব্যাপারে হতাশ হতেই হবে এটা একটা স্থির বিশ্বাস। হতাশা সহ্য করার কিংবা সহজে কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা নেই বা কম আছে। আবেগের বশবর্তী হয়ে কাজ করার প্রবণতা বেশি। আবার এমন সব কারণও থাকতে পারে যার পেছনে আছে, আমি ছাড়া অন্য কেউ বা কিছু দায়ী বলে মনে করছি। যেমন আকাশের মুখ ভার তাই আমারও মন ভার। আমাকে কেউ অপমান করেছে বলে মনে হচ্ছে কিংবা আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি তাই মন খারাপ। কোনো প্রতিযোগিতায় কারোর কাছে হেরে গেছি তাই মন খারাপ, মন বিষণ্ন।
 
Rotter-এর তত্ত্ব অনুযায়ী- প্রথম ভাগে রয়েছে অন্তর্নিয়ামক (Internal locus of control)
 
•    দ্বিতীয় ভাগে যেগুলো বহির্নিয়ামক (External locus of control)
•    প্রথমটি সম্পূর্ণভাবে ওই ব্যক্তিসম্বন্ধীয়
•    দ্বিতীয়টি স্থান-কাল-পাত্র সম্পর্কিত
•    অর্থাৎ স্থান পরিবর্তনের ফলে মন বিষণ্ন হতে পারে-
•    গ্রামের ছেলে যখন পড়াশোনা করার জন্য শহরে যায়
•    শহরের মেয়ের যদি বিয়ে হয় মফস্বল শহরে
•    সরকারি নির্দেশে ডাক্তার যখন গ্রামে যেতে বাধ্য হন তখন মনের বিষণ্ন ভাব স্বাভাবিক।
•    তেমনি আগের অপছন্দের জিনিস যদি বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয় তখনও বিষণ্ন ভাব হতে পারে। স্থান-কাল-পাত্র যেহেতু পরসপরসম্পর্কিত। মনের বিষণ্ন ভাবের পেছনে এদের যুগ্ম অবদান অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। বিষণ্ন ভাব যখন দিনের পর দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখন তা এক সময় বিষণ্নতায় পরিণত হতে পারে।
 
তবে বিষণ্নতা ভাব মাত্রেই সব সময় খারাপ ব্যাপার এটা ভাবার কারণ নেই। ইংরেজ কবির উক্তি `our sweetest songs are  those that tell of saddest thoughts.' আসলে বিষাদ ও সৃষ্টির প্রেরণা জোগাতে পারে বিষণ্নতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন মনের সব শক্তি দিয়ে সমস্যার মোকাবিলা করা, বিষণ্নতা রোগগ্রস্ত লোকের মধ্যে দেখা যায় প্রায় সব সময়-
 
•    বিমর্ষ ভাব
•    দুঃখী দুঃখী ভাব/ চেহারা
•    নিস্তেজ
•    মনমরা ও ম্রিয়মাণ ভাব
•    আচার-আচরণে জড়তা
•    অলসতা
•    ক্লান্তি/অবসন্নতা
•    কাজকর্মে উৎসাহের অভাব
•    উদ্দীপনাহীন
•    মনোযোগের অভাব
•    স্মৃতিশক্তি হ্রাস
•    ভুলে যাওয়া
•    ক্রন্দনপ্রবণতা/ কান্না করা
•    সিদ্ধান্তহীনতা/ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা
•    রাতে ঘুমাতে কষ্ট হওয়া
•    ঘুম থেকে জেগে ওঠা কষ্টকর মনে করা, তাই সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়ে থাকা
•    আহারে সমস্যা
•    অল্প ভোজন/ ভোজনহীনতা
•    ওজনের পরিবর্তন/ কমা অথবা বেড়ে যাওয়া
•    চোখের নিচে কালি পড়া
•    অপরাধবোধে তিলে তিলে কষ্ট পেতে থাকা
•    অনুশোচনা
•    কোনো কিছুতেই মনে শান্তি বা সুখ অনুভব না করা
•    একাকী অনুভূতি/শূন্যতা
•    বিরক্তি
•    উত্তেজনা/ ক্ষোভ
•    মাথাব্যথা/ মাথা ঘোরা
•    শরীর ব্যথা করা/ গা-হাত-পা ম্যাজম্যাজ করা
•    মাসিকের সমস্যা
•    যৌন সমস্যা ইত্যাদি
 
কেন এমন হয়? মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের চাহিদার সংখ্যা প্রচুর অথচ প্রাপ্তির পরিমাণ সীমিত। চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যকার ফাঁকটাই সৃষ্টি করে নানা সমস্যা। একজনের যে কোনো ক্ষমতা যতটুকু আছে তাতেই সেটা সীমাবদ্ধ। তার চেয়ে বেশিও নয়, আবার কমও নয়। এই সমস্যাটিকে স্বীকার করে নিলে কাউকেই হতাশ হতে হয় না, মন খারাপও হয় না, পরবর্তীকালে বিষণ্নতার শিকার হতে হয় না। আর বিষণ্নতা হয়েই গেলে তা অবহেলা না করে যদি দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া যায় তাহলে তা উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। কারণ মনোচিকিৎসকের পরামর্শ, সহানুভূতি ও চিকিৎসা বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীকে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করে। রোগীর মনোবল গড়ে তোলে। আর এর ফলে বিষণ্নতা তার মেজর রূপ নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই তার গতি পরিবর্তন করা যায়,  হ্রাস করা সম্ভব হয়।
 
 
বিষণ্নতা ওষুধ এবং ইসিটি
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওষুধপত্রের সাহায্যে চিকিৎসা যথেষ্ট ফলপ্রসূ হয় না। অনেক সময় খুবই অপর্যাপ্ত পরিমাণে স্বল্প সময়ের জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হয় যার ফলে রোগের উপলক্ষগুলো দূরীভূত হয় না। যদি না পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তবে ধীরে ধীরে ওষুধের সর্বোচ্চ মাত্রা প্রয়োগ করা উচিত এবং সেই মাত্রায় ওষুধটি ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ ব্যবহার করার পরই বোঝা যায় যে, ওষুধটি কাজ দিচ্ছে কি না। আবার যদি অল্প ওষুধেই রোগীর উন্নতি সাধন হয় তবে সেই পরিমাণেই ওষুধটি চালিয়ে যাওয়া উচিত। যদি সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও রোগী সুস্থবোধ না করে তবে রক্তে ওষুধটির পরিমাণ নির্ধারণ করে দেখা যেতে পারে।
 
মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতার ওষুধপত্র সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করা প্রয়োজন এবং এর সময়সীমা হচ্ছে রোগ উপশমের পর প্রায় ৬ মাস থেকে ১ বছর। একথা মনে রাখা বিশেষ প্রয়োজন যে, যেসব রোগী কিছুদিন ওষুধ খাওয়ার পর হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করে দেন তারা কিন্তু নিজেদের খুবই বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, কারণ সেসব ক্ষেত্রে আবার রোগের লক্ষণগুলো পুনঃপ্রকাশিত হয় এবং তখন চিকিৎসা আরো কঠিন এবং বিলম্বিত হয়ে পড়ে। তাই মনোচিকিৎসক বা ডাক্তারের মতামত ছাড়া কখনোই ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয় এবং সঠিক সময়ের পরে ডাক্তার নিজেই ধীরে ধীরে ওষুধটিকে প্রথমে কমিয়ে আনেন এবং তারপর বন্ধ করে দেন। হঠাৎ ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করলে নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।
 
TCA বা Tricyclic ও Tetracyclic anti depressants গ্রুপের আলোচনায় বলা হয়েছিল যে, যদি কোনো একটি ওষুধে কাজ না দেয় তবে এর সঙ্গে কিছু কিছু অন্য ওষুধ যোগ করা হয়। অন্য গ্রুপের ওষুধের সাথে এই যুক্ত চিকিৎসা সম্ভব। প্রধানত-
 
•    Iithium
•    Iiothyrinine বা
•    L-Tryptopham যোগ করা হয় আর যদি তাতে কাজ না দেয় তবে অন্য গ্রুপের কোনো ওষুধের ব্যবহার করা প্রয়োজন।
 
ইসিটি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ছাড়া বিষণ্নতার চিকিৎসার আলোচনা অসম্পূর্ণ ও অর্থহীন। ইসিটির গোড়ার কথা দিয়ে শুরু করা যাক। ১৯৩৪ সালে লাজলো ডন মেডুনা ক্যাটাটনিয়া এবং সিজোফ্রেনিয়া রোগের চিকিৎসায় ওষুধের সাহায্যে খিঁচুনি সৃষ্টি করে রোগীর উন্নতি ঘটান। প্রথমে ক্যামফর এবং পরে intravenous penty1 eneterazol ব্যবহার করে তিনি খিঁচুনি তৈরি করেন। তবে তার সমস্ত গবেষণাটাই ছিল সিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে। এর পর উগো সেরলেত্তি এবং লুসিও বিনি প্রথমবার এই পদ্ধতি প্রয়োগ করলেন এপ্রিল ১৯৩৮ সালে রোম শহরে। প্রথমদিকে অনেক ক্ষেত্রে হাড় ভাঙার সম্ভাবনা থাকত, তাই পরে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হতে লাগল, যাতে মাংসপেশির অধিক সংকোচন না ঘটে, যেমন Succinycholine যার ব্যবহার ১৯৫১ সালে আরম্ভ হয়, এই ‘শক’ থেরাপি আমাদের চলচ্চিত্র এবং অন্যান্য গণমাধ্যম এক ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক ব্যবস্থায় পরিণত করেছে-কত সিনেমায় দেখা যায় খলনায়ক ও তার সহকারী নায়ক-নায়িকা বা তাদের আত্মীয়-স্বজনকে ‘শক’ দিয়ে পাগল করে দিচ্ছে। আর আজ তাই আমাদের মতো অর্থনৈতিকভাবে পেছনের সারির দেশে একটি যথাযথ এবং সস্তা চিকিৎসা পদ্ধতি কিছুটা ব্রাত্য হয়ে রয়েছে।
 
মস্তিষেকর মধ্যে অবস্থিত বিভিন্ন গ্রাহকের ওপর কাজ করে এবং তাদের কারো ক্ষমতা বাড়িয়ে আর কারো কমিয়ে স্নায়ুতন্ত্রের প্রায় সমস্ত কোষকে আন্দোলিত করে এক ব্যাপক খিঁচুনি ঘটায় ইসিটি। যার ফলে মানসিকভাবে অবসন্ন রোগী খুবই দ্রুতগতিতে এবং নিশ্চিতভাবে উন্নতি লাভ করে। বিশেষত আত্মহননের ইচ্ছা যাদের মধ্যে প্রবল তাদের ক্ষেত্রে এ এক অমোঘ চিকিৎসা। আবার যারা উত্তেজিত বা নিঃসার, যারা ওষুধ বা অন্য চিকিৎসায় ফল পাননি তাদের ক্ষেত্রেও এর অবদান অবিসংবাদী। ওষুধে কাজ হয়নি এমন ১০০ জন রোগীর প্রায় ৭০ জনই ইসিটিতে উপকার পায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক পর্যায় এমন পরিবর্তন সাধিত করে ইসিটি যে, যে ওষুধ আগে কাজ দিত না, তাই পরবর্তীকালে কাজ দিতে আরম্ভ করে। বিষণ্নতার ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে ২-৩টা ইসিটি দেয়া যায় এবং সব মিলিয়ে ৬-১২টি এমনকি ২০টি অবধি ইসিটি দেয়াও সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছুদিন ইসিটি দেয়া হয়ে থাকে যাকে বলা হয় Maintenance ECT। কিছু বছর আগেও বহু ক্ষেত্রে ইসিটি দেয়া যেত না তবে আজ বোধহয় তাদের সংখ্যা খুবই সীমিত যেসব ক্ষেত্রে ইসিটি ব্যবহার করা যায় না। তার মধ্যে যাদের কোনো ধরনের মস্তিষেকর টিউমার আছে বা যাদের নিকটবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাক বা Myocardial infraction হয়েছে অথবা যাদের রক্তচাপ খুবই বেড়ে গেছে তারা পড়ে। গর্ভবতী মাকে ইসিটি দেয়া যায়, তবে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে। যেসব বিষণ্নতা রোগীর সমস্যাগুলো বিশেষ কোনো ঋতুতে বৃদ্ধি পায় তাদের ক্ষেত্রে এক অভিনব চিকিৎসা পদ্ধতি লাইট থেরাপি বা ফটো থেরাপি।
 
বিদেশে সচরাচর শরৎ ও শীতে অবসন্নতা বা বিষণ্নতা বাড়ে, আর আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বর্ষাকেও এ রকম গুরুত্ব দিতে হয়। এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে খুবই উজ্জ্বল আলো (2,500 Lux) বি্যবহৃত হয়, যা সাধারণ ঘরের আলোর প্রায় ২০০ গুণ উজ্জ্বল। ভোরের আগে এবং গোধূলিবেলায় এই আলোর সাম্রাজ্যে রোগীকে ঘণ্টা দুয়েক রাখা হয় এবং মাঝেমধ্যে আলোর দিকে তাকাতে হয়। সচরাচর সামান্য কয়েক দিনের মধ্যেই রোগের উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানকালে ভাবা হচ্ছে এক্ষেত্রে মাত্র এক ঘণ্টা থেরাপিই যথেষ্ট। কেউ কেউ ভাবেন ঘুমের সময়ের পরিবর্তন বা ঘুমের বিলম্ব ঘটালে অবসাদ বা বিষাদগ্রস্ত রোগী কিছুটা ভালো থাকতে পারে। আকুপাংচার বা আকুপ্রেসারের সাহায্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষণ্নতা রোগের উপশম সম্ভব বলে মনে করেন কোনো কোনো গবেষক।
 
সবশেষে একটি বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা একান্ত আবশ্যক। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে যে রোগী বা যার মধ্যে আত্মহননের প্রবল ইচ্ছা পরিলক্ষিত হয় তাদের চিকিৎসা কিন্তু আপৎকালীন ভিত্তিতে করা প্রয়োজন। যদিও কোনো মানসিক চিকিৎসালয়ে ভর্তি করে নিয়ে চিকিৎসা করা ভালো তবুও যদি তা সম্ভব না হয় তবে বাড়ির লোকদের বিশেষভাবে দায়িত্ব নিতে হবে এবং তাহলে রোগীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে। অত্যন্ত গভীরভাবে বিষণ্ন বা মেজর ডিপ্রেশন রোগীর ক্ষেত্রে অনেক সময়ই ইসিটি উপকার দেয়, তবে তার সঙ্গে সাপোর্টিভ সাইকোথেরাপিও প্রয়োজন।
 
 
বিষণ্নতার চিকিৎসায় ওষুধ
বিষণ্নতা আজকের যুগে দাঁড়িয়ে যেন প্রত্যক মানুষেরই জীবনসঙ্গী হয়ে পড়েছে। ‘বিষণ্নতা হয়েছে’ কথাটা আজ মধ্যবিত্ত ও শহুরে মানুষের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত ও আলোচিত কিন্তু দু দশক আগেও কি তার বিস্তার এতটা ব্যাপক ছিল। আপাতদৃষ্টিতে নিশ্চয়ই নয় কিন্তু আসলে হয়তো আমরা বরাবর হিমশৈলের চূড়াটাই দেখি, তার নিচের আধা অবসাদের বিশাল শৈল পর্বতটি দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। আজকের দিনে মানসিক অবসাদ প্রায় মহামারী হয়ে উঠেছে, বেড়েও চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং মনোবৈজ্ঞানিকরা এ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছেন। তাদের ভাণ্ডারে মজুদ রয়েছে বিভিন্ন ওষুধপত্র এবং ওষুধবহির্ভূত চিকিৎসা পদ্ধতি।
 
এককালে শুধু বিষণ্নতার ক্ষেত্রে নয় প্রায় সব ক্ষেত্রেই চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল নিতান্ত অপ্রতুল এবং তাই সামান্য কিছু ওষুধ দিয়েই চিকিৎসা চালাতে হতো। ১৯৫০ সালে চারপেনটিয়ার আবিষকার করলেন Chlorpromazine, যা সিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে আজো ব্যবহৃত হয় এবং এই ওষুধটি নিয়ে গবেষণার সূত্রে আবিষকৃত হলো Imipramin এবং দেখা গেল Imipramin উত্তেজনা না কমাতে পারলেও তা বিষণ্নতা কাটাতে সাহায্য করে। এর পর শুরু হলো Monoamine Oxidase Inhibitors বা MAOI-এর ব্যবহার বিষণ্নতার ক্ষেত্রে। কিন্তু ১৯৬২ সালে এক রোগী MAOI-র সঙ্গে টাইরামিনে ভরপুর চিজ খাওয়ার পরে High Blood Pressure জনিত কারণে মারা গেল। তখন গঅঙও দের অবসাদের চিকিৎসা থেকে সাময়িক সরিয়ে নেয়া হলো এবং প্রায় এ সময়েই Tricyclic antidepressants আবিষকৃত হতে লাগল এবং ব্যবহৃত হতে থাকল। এর পরের সময়টা ব্যাপক গবেষণার সাহায্যে বোঝা গেল যে, বিশেষ কিছু কিছু স্নায়ু রাসায়নিকের পরিবর্তনের কারণে এই রোগের সৃষ্টি হয়। আশির দশকে Fluoxetine আবিষকৃত হওয়ার পর যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটল বিষণ্নতার চিকিৎসার ক্ষেত্রে। SSRI গ্রুপের অন্য ওষুধও আসতে থাকল এবং সংযুক্তভাবে তারা Tricyclic antidepressants কে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিল। এ মুহূর্তে SSRI গ্রুপের ওষুধগুলোই অবসাদের ক্ষেত্রে প্রথম সারির ওষুধ বলে মনে করা হয়, কারণ এদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা Sideeffects TCA-এর থেকে তুলনামূলক অল্প এবং অতিগ্রহণের ফলে বিপদের সম্ভাবনা কম।
 
•    মিরটাজাপিন
•    ভেনলাফ্যাক্সিন
•    নতুন ধরনের MAOI এবং আরো নানা ওষুধ আবিষকৃত হওয়ার ফলে বিষণ্নতার চিকিৎসা আজ অনেক সহজ এবং সাফল্যের সম্ভাবনাও অনেক বেশি। একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক ধরনের ওষুধ বেছে নিতে হয়। যদি দেখা যায়, আগে কখনো রোগী বা তার আত্মীয়-স্বজন কোনো একটি বিশেষ ধরনের ওষুধের সাহায্যে সুস্থ হয়ে উঠছেন তবে আবারও সেই ওষুধটিই দেয়া উচিত। যদি সে রকম কোনো রোগের ইতিহাস না থাকে তাহলে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো মাথায় রেখে বিবেচনা করতে হবে। একটি বিশেষ ধরনের ওষুধ হয়তো একজন রোগীর ক্ষেত্রে খুবই উপকারী আবার অন্য একজনের ক্ষেত্রে হয়তো যথেষ্ট উপকারে নাও আসতে পারে। মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতা রোগের চিকিৎসায় ওষুধপত্রের খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে এবং বিজ্ঞানের অসামান্য অগ্রগতির যুগে নতুন নতুন ওষুধ আবিষকৃত হচ্ছে এবং আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাকে সাহায্য করছে আরো আধুনিক, আরো সহজ হয়ে উঠতে। সে সমস্ত ওষুধ নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।
বিষণ্নতার ওষুধগুলোকে সাধারণত কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়েছে-
•    Monoamine Oxidase Inhibitors (MAOI)
•    ফেনেলজিন
•    ট্র্যানিলসাইপ্রোমিন
•    মোক্লোবেমাইড
•    সেলেজেলিন
•    ব্রোকারোমিন
•    Tricyclic and Tetracyclic antidepressants
•    অ্যামিট্রিপটাইলিন
•    ক্লোমিপ্রামিন
•    ইমিপ্রামিন
•    ডোথিয়েপিন
•    ডক্সোপিন
•    আমক্সোপিন
•    ম্যাট্রোটিলিন
•    Selective Serotonin Reuptake Inhibitors (SSRI)
•    সারট্রালিন
•    ফ্লুওক্সেটিন
•    পারওক্সেটিন
•    ফ্লুভক্সেমিন
•    সিটালোপ্রাম
•    Serotonin Norepinephrine Reuptake Inhibitors (SNRI)
•    ভেনলাফ্যাক্সিন
•    Nore Pinephrine Dopamine Reuptake Inhibitors (NDRI)
•    বুপ্রোপিয়ন
•    Noradrener Gic and Specefic serotoner gic antidepressants (NASSA)
•    মরটাজাপিন
•    Other
•    নেফাজোডন
•    ট্রাজোডন
•    অ্যামফিটামিনড
বিষণ্নতা টিসিএ ও অন্যান্য ওষুধের কথা
অনেক ক্ষেত্রে Tricyclic ও Tetracyclic antidepressants বা TCA এবং  Selective Serotonin Reuptake Inhibitors বা SSRI একসঙ্গে  প্রয়োগ করা হয়, সেক্ষেত্রে দুটিরই মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সঠিকভাবে। কোনো রকম TCA বা SSRI গ্রুপের ওষুধ MAOI-এর সঙ্গে দেয়া যায় না এবং দেখা গেছে যে-
 
•    Fluoxetine বা
•    Sertraline অন্য ওষুধের সঙ্গে খুব সহজভাবেই দেয়া যায়, কিন্�