মা হওয়ার আগে তথ্যসমূহ ২য় সন্তান নিতে ইচ্ছুক যারা

আপনি কি দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার জন্য প্রস্তুত ?

আপনি এবং আপনার স্বামী কি আরেকটি সন্তান নেয়ার কথা ভাবছেন? একবার তো মা হলেন, দ্বিতীয়বার গর্ভধারণ করার জন্য এখনি আপনি শারীরিকভাবে প্রস্তুত তো? যদি মনে করেন যে আপনি প্রস্তুত আছেন, তাহলে দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে মাঠে নামার আগে নিচের বিষয়গুলোও মাথায় রাখুন -


কিছু গরুত্বপূর্ণ বিষয় -


•    মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা প্রথম ও দ্বিতীয় বাচ্চা নেয়ার মাঝে অন্তত ১৮ মাস বিরতি দেয়ার ব্যাপারে জোর দেন। এর ফলে প্রথম গর্ভধারণের পর শরীর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে যথেষ্ট সময় পায়।


•    বাংলাদেশের নারীদের ক্ষেত্রে এই বিরতি অন্তত ২ বছর পর্যন্ত বর্ধিত হওয়া উচিত। কারণ এদেশে বেশিরভাগ নারীই কম-বেশি রক্তশূন্যতা বা অন্যান্য পুষ্টির অভাবজনিত রোগে ভুগে থাকে।


•    উপর্যুপরি গর্ভধারণের ফলে শরীরের প্রয়োজনীয় লৌহ, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন-এর সরবারহ পুনর্স্থাপন করা নারীর শরীরের পক্ষে কঠিন হয়ে যায়।


দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পূর্বে যে সকল বিষয় মাথায় রাখা জরুরি -

অনেক দম্পতির ক্ষেত্রেই দ্বিতীয়বারের গর্ভধারণ আনন্দময় একটি চমক হিসেবে আসতে পারে। কখনো কখনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই যা হয়ে যায়, সেটাই হতে পারে একটা দারুণ ব্যাপার! কিন্তু যারা অনেক ভেবেচিন্তে দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আগেই ভাবনা-চিন্তা করা জরুরি।

সবার আগেই ভাবতে হবে বয়স নিয়ে। আপনার বয়স কত সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে আপনার যদি আবারো বাচ্চা নেয়ার চিন্তা থাকে। যদি আপনার বয়স ৩০ পার হয়ে যায়, তাহলে দ্বিতীয় বাচ্চা নিতে হলে যত দ্রুত সম্ভব নিয়ে নেয়া উচিত। দুই বাচ্চার পর আরও বাচ্চা নিতে চাইলে তো বিষয়টি বিবেচনায় আনা আরোই বেশি প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে মেয়েদের ৩৫ বছর বয়স পার হয়ে গেলে যত বয়স বাড়ে গর্ভধারণ করাটা ততই কঠিন হয়ে পড়ে আর গর্ভকালীন জটিলতার সম্ভাবনাও বাড়তে থাকে। তাছাড়া ৩৫ বছরের বেশী বয়সে গর্ভধারণের ফলে ডাউন’স সিনড্রোম (Down's Syndrome) কিংবা অন্যান্য জেনেটিক জটিলতার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে আপনার স্বাস্থ্য। আপনার সর্বশেষ গর্ভাবস্থার সময় কি আপনি অনেক দূর্বল আর ক্লান্ত বোধ করতেন? আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি শারীরিক ও মানসিকভাবে আরেকবার গর্ভধারণ করতে প্রস্তুত? কারণ আপনার গর্ভে বাড়তে থাকা সন্তানের পাশাপাশি আপনাকে কিন্তু আরেকটি বাচ্চার দেখাশোনার কাজটিও করতে হবে। আপনি কি ডায়াবেটিস, বা হৃদরোগ অথবা অথবা অন্য কোন সংক্রমণের (infection) জন্য নিয়মিত ওষুধ খান? কিছু কিছু ওষুধ গর্ভস্থ শিশুর জন্য ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, ফলে ভালো হয় যদি আপনি ওষুধের কোর্স সম্পন্ন করে কিংবা প্রেসক্রিপশন পাল্টে নিয়ে তারপর গর্ভধারণ করেন। আগেই ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিন, যে ওষুধগুলো এখন খাচ্ছেন, গর্ভাবস্থায় সেগুলো কোন ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলবে কি না।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই বিবেচনার সময় বাদ পড়ে যায়, আর সেটা হচ্ছে দ্বিতীয়বার গর্ভধারণ করার সময়টুকু কিংবা দুই সন্তানের লালন-পালনের ক্ষেত্রে আপনি আপনার সঙ্গী ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কতটুকু সহায়তা আশা করতে পারেন। আপনি যদি কর্মজীবী মা হন এবং কাজ চালিয়ে যাবেন বলে ঠিক করেন, তাহলে তাদের কাছ থেকে আপনার সকল ক্ষেত্রেই সহায়তার প্রয়োজন হবে, তা আপনি দ্বিতীয় গর্ভধারণের আগে দুই বছর বা তার বেশি যতদিন বিরতিই নেন না কেন। আপনার যদি দুইটি ছোট ছোট বাচ্চার দেখাশোনা করতে হয়, তাহলে আপনার কারো না কারো সার্বক্ষনিক সহযোগিতা লাগবেই। অপরদিকে, আপনার প্রথম সন্তানের বয়স যদি ৭ বছরের বেশি হয়, তাহলে সে নিজেও নতুন শিশুর দেখা-শোনার ক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে, যেমন আপনি যখন ব্যস্ত থাকবেন তখন বাচ্চাটির দিকে নজর রাখা বা তার সাথে খেলাধূলা করা, ইত্যাদি। তার চাইতেও বড় বাচ্চা হলে নতুন শিশুর দেখাশোনার ক্ষেত্রে বেবি সিটিং (baby sitting) এর মতো বড় দায়িত্বও সে নিতে পারবে।

এক সন্তানের কর্মজীবী মা তার কাজ থেকে যতটা বিরতি নেবে, তার চাইতে বেশি বিরতি নেয়ার প্রয়োজন থাকে সেসব মায়েদের যাদের দুজন বা তার বেশি সন্তান আছে। দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক অবস্থা এবং দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়টাও আগে থেকে ভেবে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের ক্ষেত্রেই কয়েক বছর পর পর বাচ্চা নেয়ার জন্য কাজ থেকে ছুটি নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে তারা হয়তো পর পর দুই সন্তানের জন্ম দিয়ে দেবার কথা চিন্তা করে একবারে একটি লম্বা কর্মবিরতি নিয়ে নেন।

আগেই যেমন বলা হলো, যারা দ্বিতীয় সন্তান নিচ্ছেন তাদের একই সাথে দুইজন সন্তানেরই দেখাশোনা করার কাজটি করতে হয়। প্রথম বাচ্চার বই, খেলনা, কাপড়-চোপড় হয়তো দ্বিতীয় বাচ্চার জন্যও ব্যবহার করে ফেলা যায়, কিন্তু ডায়াপার, ফর্মুলা কিংবা অন্যান্য জিনিসপত্রের জন্য কিন্তু আপনার দ্বিগুণ খরচ করতেই হচ্ছে। আপনি কি একই সময়ে দুই সন্তানের চড়া স্কুল বেতন, কিংবা পরবর্তী সময়ে কলেজের পড়ালেখার খরচ বহন করতে পারবেন? অনেক দম্পতিই সন্তানদের প্রয়োজনীয় খরচের ভারসাম্য রাখার জন্য অন্তত চার-পাঁচ বছরের বিরতিতে সন্তান নেন, ফলে তাদের ওপর আর্থিকভাবে তেমন চাপ পড়েনা।

আপনার প্রথম সন্তানের বয়স যখন ১০ বা তার বেশি:

প্রথম সন্তান যখন মোটামুটি সাবালক হয়ে যায়, তখন আবারও ঘর জুড়ে একজন শিশুর উপস্থিতির জন্য অনেকেই এরকম লম্বা বিরতির পর দ্বিতীয় সন্তান নেন। এক্ষেত্রে বড় ভাই বা বোন যেমন বাচ্চাটির দেখাশোনার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে, তেমনি সে স্কুলে ভর্তি হলে তার লেখাপড়া ও বাড়ির কাজেও সাহায্য করতে পারে। আবার অনেক সময়ই বয়সের এত পার্থক্যের কারণে দুজনের মধ্যে অতটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়না যতটা আপনি অভিভাবক হিসেবে আশা করেন। ফলে আর কয়েক বছর পরে সন্তানদের প্রাত্যহিক কর্মসূচি সামলানোটা আপনার জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে।

আপনার প্রথম সন্তানের বয়স যখন ৩-৫ বছর:

আপনি যদি আপনার শিশুর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতা এবং তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায়কে উপভোগ করতে চান, তাহলে প্রত্যেক সন্তানের জন্মের মাঝে কয়েক বছর বিরতি নেয়াই উত্তম। তাতে করে অবশ্য ভাইবোনদের মধ্যে স্বাভাবিক একটা রেষারেষি থাকবে, কিন্তু আপনার কনিষ্ঠ সন্তান তার সামনে একজন রোল মডেলও পাবে যাকে দেখে সে অনেক কিছুই শিখবে। অনেক মা-ই জানিয়েছেন যে বড় ভাই বা বোন থাকলে পরেরজন বেশ তাড়াতাড়িই কথা বলা, হাঁটা শিখে যায় এবং তাদের অন্যান্য বিকাশও দ্রুততর হয়। আবার সন্তানের প্রথম কয়েক বছরে তার দেখাশোনা করতে গিয়ে আপনার রাত-জাগা কিংবা অন্যান্য সকল শারীরিক পরিশ্রম থেকেও তো আপনি কয়েক বছরের বিরতি পাচ্ছেন।

আপনার প্রথম সন্তানের বয়স যখন ২ বছরের কম:

বাচ্চার জন্ম দেয়া এবং তার প্রথম কয়েক বছরের দেখাশোনার সময়টুকু কমিয়ে আনাও সম্ভব যদি একদমই স্বল্প বিরতিতে আপনার দুই সন্তানের জন্ম হয়। এর আরেকটা উপকারী দিক হচ্ছে যে দুই সন্তানের মধ্যে রেষারেষি’র ভাব কম থাকবে, বরং তারা একে অপরের খেলার সঙ্গী হবে। আবার অনেক মা-ই বলেছেন রাতে যদি এক সন্তানকে খাওয়াতে বা তার কাথা বা ডায়াপার বদল করার জন্য উঠতে হয়, আরেকজনকে দেখে রাখাও তখন কঠিন হয় না । তবে হ্যাঁ, পরবর্তী কয়েক বছর আপনার চারপাশে প্রচণ্ড হই-হট্টগোলের জন্য প্রস্তুত থাকুন। কিছু কিছু দম্পতি এতে বেশ ক্লান্ত হয়ে যান, আবার আলাদাভাবে কোনো একজন সন্তানকে সময় দেয়াটাও বাবা-মা’র পক্ষে সম্ভব হয় না। আবার প্রায় সমবয়সী দুইজন সন্তান থাকাটা বেশ ব্যয়বহুলও বটে।

তবে, এটাও মনে রাখতে হবে যে প্রত্যেকটা অভিজ্ঞতাই একেক পরিবারের জন্য একেক রকম। আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, আপনি যদি দ্বিতীয় সন্তান নেবেন বলে ভেবে থাকেন, তাহলে স্বাস্থ্যগত কারণের কথাই সবার আগে ভাবুন। সন্তানের বয়সের পার্থক্য কম বা বেশি হবার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। দিন শেষে সিদ্ধান্তটা আপনার এবং আপনার স্বামীর, এবং এটাও মনে রাখবেন যে সব কিছুরই শেষটা ভালো হতে পারে।