স্বাস্থ্য সুরক্ষা তথ্যসমূহ ডায়াবেটিস এবং খাওয়া-দাওয়া

ডায়াবেটিস এবং খাওয়া-দাওয়া

ডায়াবেটিস রোগীদের সঙ্গে আলাপ করলে মনে হয়, তারা অনেকে মনে করেন ডায়াবেটিস হলে কেবল যে চিনি-মিষ্টি বাদ দেওয়া তাই নয়, খাওয়া-দাওয়া থেকে 'মজা করে খাওয়া' শব্দটি উঠে গেলো। কিন্তু সত্যি কি তাই? বস্তুত: আমেরিকান ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের পরামর্শ:খাদ্যে শ্বেতসারের পরিমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কি ধরণের শর্করা গ্রহণ করা হচ্ছে এর তদারকি করা। সুসংবাদটি হলো, অনেক প্রিয় খাদ্য এমনি খাওয়া যায় বা সামান্য বদল করে খাওয়া যায়, করা যায় একে ডায়াবেটিস বান্ধব এবং উপভোগ্যও বটে। ব্যায়ামের অভাব, ঘুমের ব্যাঘাত, স্ট্রেস, টেনশন ও খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম ডায়াবেটিসের অন্যতম কারণ। অনিয়মিত জীবনযাপনের জন্য ওজন বাড়ছে দ্রুতহারে। আর তাই ডায়াবেটিসও জেঁকে বসছে। তাই ওজন ঠিক রাখার পাশাপাশি ভুঁড়ি বাড়তে না দেওয়াই হলো ডায়াবেটিসকে দূরে রাখার উপায়। আর তাই প্রয়োজন লো ফ্যাট, হাইনিউট্রিয়েন্টস ও মডারেট ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাওয়া এবং মন ভালো রাখা। রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাওয়াদাওয়ার জরুরি ভূমিকা রয়েছে। তার মানে কিন্তু এই নয় যে সব ভালো খাবার থেকে সব সময় দূরে থাকতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীও একটু মিষ্টি খেতেই পারবেন। আসলে দরকার হলো পরিমিতিবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা।


ডায়েটে কী রাখবেন:


•     প্রথমেই কার্বোহাইড্রেটের প্রসঙ্গে বলা যাক। রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট যেমন—ময়দা, চাল, পাউরুটি ইত্যাদি বাদ দিন। পরিবর্তে বেশি ফাইবারযুক্ত কার্বোহাইড্রেট যেমন—ভুসিযুক্ত আটার রুটি, ঢেঁকিছাঁটা চাল বা ব্রাউন রাইস, কর্নফ্লেক্সের পরিবর্তে ব্র্যানফ্লেক্স খান।


•     চিনিযুক্ত নাশতার সিরিয়ালের পরিবর্তে হাই ফাইবার ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, ইনস্ট্যান্ট ওট মিলের বদলে রোলড ওটস বা স্টিল কাট ওটস বেছে
নিন।


•     আলু যতই ভালোবাসুন না কেন, কমিয়ে দিতে হবে। বাঁধাকপি, ব্রকলি, ফুলকপি খাওয়া ভালো। রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আর হাই ফাইবার কার্বোহাইড্রেট অনেকটা সময় নিয়ে হজম হয়, তাই রক্তে চিনির মাত্রা অতিরিক্ত বাড়াতে পারে না।


•     মিষ্টি খেতে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের তো বটেই, যাঁরা মিষ্টি ভালোবাসেন না, তাঁদেরও ডায়াবেটিস হলে মিষ্টির প্রতি আকাঙ্ক্ষা বাড়ে। ডায়াবেটিস হলে যে মিষ্টি একেবারে বাদ দিতে হবে তা কিন্তু নয়। মাঝেমধ্যে দু-একটি মিষ্টি বা পায়েস-সেমাই একটু খাওয়া যায়। যেদিন মিষ্টি খাবেন, সেদিন একটু বেশি করে হাঁটবেন। তাহলেই আর অসুবিধা নেই।


•     ফ্যাট বা তেলজাতীয় খাবার খেতে হবে বুঝেশুনে। স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্র্যান্স ফ্যাট ডায়াবেটিস রোগীর জন্য তো বটেই, কারো জন্যই ভালো নয়। গুঁড়া দুধ, ভেজিটেবল অয়েল, প্যাকেটজাত পণ্য, লাল মাংস ইত্যাদি এড়িয়ে চলুন। এগুলোয় ওজনও বাড়ে দ্রুত। অলিভ অয়েল, ক্যানোলা অয়েল, ফ্ল্যাক্স সিড, বাদাম, অ্যাভোকাডো, ননিবিহীন দুধ, দই ইত্যাদি ভালো।


•     উচ্চমাত্রার ফাইবারযুক্ত সবজি যেমন শিম, ব্রকলি, মটরশুঁটি, বাঁধাকপি ইত্যাদি রাখুন ডায়েটে। ডালজাতীয় খাবারও রাখতে পারেন। এগুলোর প্রতিটিই ডায়াবেটিসের জন্য ভালো। উচ্চ ফাইবারযুক্ত ফল যেমন—পেঁপে, কমলালেবু, আপেল, নাশপাতি, পেয়ারা ইত্যাদি খান। কলা, আম বা আঙুরের মতো ফলে ক্যালরি বেশি থাকে। তাই এই ফলগুলো পরিমিত পরিমাণে খাবেন। খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম আর পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকতে হবে। একবারে বেশি খাওয়া ঠিক নয়, সারা দিনেই অল্প অল্প করে খাবার খাওয়া ভালো।* টক জাতীয় ফলঃ
ভিটামিন সি জাতীয় ফল বিশেষ করে টক জাতীয় ফলগুলো ডায়াবেটিকদের জন্যে অন্যতম।ভরা পেটে রুটিন করে দুপুরের খাবার আর বিকেলে হাল্কা নাস্তার পর রুটিনে রাখা উচিত।

•     এ ছাড়া ব্রেন ও হার্টকে ঠিক রাখতে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। টুনামাছসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ, ফ্ল্যাক্স সিড ইত্যাদিতে পাওয়া যায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড।


•     অতিরিক্ত ওজন অনেক সময় ডায়াবেটিসের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। তাই ওজন স্বাভাবিক রাখতে হবে। মাত্র ৭ শতাংশ ওজন কমাতে পারলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে অর্ধেক হয়ে যায়। তবে ওজন কমাতে হবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে। অনেকেই ওজন কমাতে গিয়ে সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবার বাদ দেন, যা একেবারেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। বরং নাশতা ঠিকমতো খাওয়া উচিত। নাশতায় রাখতে পারেন ওটস, লাল আটার রুটি, সবজি, ফল, ডিমের সাদা অংশ ও সর ছাড়া দুধ।
 
করতে হবে ব্যায়ামও:


ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাওয়াদাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যায়ামও অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওজন যেমন ঠিক রাখতে হবে তেমনি শরীরে গ্রহণ করা ক্যালরি পুড়িয়ে ফেলতেও হবে। তাই নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম অবশ্যই করবেন। তবে ব্যায়াম করার আগে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে  জেনে নিন কতটা সময় ও কী ধরনের ব্যায়াম করবেন।


সহকারী অধ্যাপক
ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।