আপনার জন্য তথ্যসমূহ প্রবাসী বাবা

প্রবাসী বাবা

প্রবাসী বাবা : বিদেশে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন, তাদের একটি বড় অংশেরই সন্তান-সন্ততি ও পরিবার পরিজনেরা থাকেন দেশে। এমন প্রবাসী বাবাদের অনেকেই নিয়মিত দেশে আসার সুযোগ পান না। অনেককেই বছরের পর বছর লাগাতার বিদেশেই থাকতে হয়। পরিবারের বড় সদস্যরা এ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও প্রবাসী বাবার সঙ্গে এমন দূরত্ব শিশু-কিশোরদের জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে।

শিশুরা মা-বাবার, ভাইবোনের আদর-যত্নে বড় হয়ে ওঠে। নিয়মিত ও স্বাভাবিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে শিশুরা বড়দের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বুঝতে শেখে। বাবা, মা, ভাই, বোন বা প্রত্যেকের সঙ্গে তাদের নিজস্ব একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একসঙ্গে বসবাসের ফলেই একে অন্যের পছন্দ, অপছন্দ বুঝতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন দূরে থাকলে অন্যের পছন্দ, অপছন্দগুলো ভালোভাবে জানা যায় না। এটা একসময় বাড়তে বাড়তে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হতে পারে, যা স্বাভাবিক পারিবারিক সম্পর্কে কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন দূরে থাকায় প্রবাসী বাবার সঙ্গে সন্তানের এমন দূরত্ব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

দূরে থাকায় সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটাই হয়ে পড়ে আনুষ্ঠানিক; বিশেষ করে যখন শিশুরা একটু বড় হয়ে উঠতে শুরু করে। বাবা ফোন করে বলেন, কেমন আছ? শরীর কেমন? পড়াশোনা ঠিকমতো করছ তো? মায়ের কথা শুনবে, ভাইয়া-আপুর কথা শুনবে। এর বাইরে যেন কথা আর এগোয় না। একটা সময়ে যখন দেশ-বিদেশে ফোনে কথা বলাটা ছিল অনেক বেশি ব্যয়বহুল, তখন এ সমস্যা ছিল আরও বেশি প্রকট। এখন ফোনের খরচ কমার পাশাপাশি অনেকেই দীর্ঘক্ষণ অনলাইনে, স্কাইপে এমনকি অনেকে ফেসবুকেও কথা বলার সুযোগ পান। কিন্তু তারপরও ছেলেমেয়ের বেড়ে ওঠাটা প্রবাসী বাবার অনেকটা অজানা রয়ে যায় আর এমন শিশু-কিশোরেরাও বাবাকে কাছে না পাওয়ায় তাঁকে ঠিকমতো বুঝতে পারে না, তাঁর সঙ্গে সহজ হতে পারে না। বাবা যখন দেশে ফেরেন, সন্তানকে কাছ থেকে দেখেন, ভুলত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করেন, কোনো বিষয়ে শাসন করেন, তখন অনেক সন্তানই তা সহজভাবে নিতে পারে না। একত্রে বসবাস করলেও দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের অভ্যস্ততা থেকে বেরোতে কষ্ট হয় তাদের। এ অবস্থায় বাবার সঙ্গে সন্তানের মান-অভিমান বেড়ে যায়, এমনকি ঝগড়াঝাঁটিও হতে পারে।


এমন সন্তানেরা কী বলছে
ঢাকার একটি স্কুলে দশম শ্রেণীর ছাত্রী সুমাইয়া আলী (ছদ্মনাম) বলেছে, ‘আব্বু যখন দেশের বাইরে ছিলেন, তখন প্রতিদিন মোবাইলে কথা হতো, আম্মুকে সব সময় বলতেন আমাদের যেন মারধর না করে, বকা না দেয়। আব্বুকে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো আব্বু মনে হতো। এখন আব্বু আমাদের সঙ্গেই থাকেন। কিন্তু প্রায়ই ছোট ছোট অনেক কারণে অনেক বকাঝকা করেন। আমার কথা বলা থেকে শুরু করে পোশাক-আশাক নিয়েও তাঁর আপত্তি। এখন সারা দিনে হয়তো একটাও কথা হয় না আব্বুর সঙ্গে।’


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তানভির মাহমুদ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমার বয়স যখন তিন বছর, তখন বাবা বিদেশে যান। এখন তিনি পাকাপাকিভাবেই দেশে থাকেন। বাবা খুব একটা শাসন যে করেন তা নয়, কিন্তু আমার সঙ্গে কখনোই বাবার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়নি। এমনকি আমার বোনের সঙ্গেও না। বাবা অনেক বেশি গম্ভীর প্রকৃতির। তাই আমরা সম সময় তাঁর থেকে একটু দূরে দূরেই থেকেছি। বাবা আমাদের একটু সময় দিলে হয়তো এত দূরত্ব সৃষ্টি হতো না। মাঝেমধ্যে এ জন্য খুব খারাপ লাগে।’


মনোবিজ্ঞানীরা যা বলেন
প্রবাসী বাবার সঙ্গে সন্তানের এই টানাপোড়েনের মূল কারণ কী হতে পারে—সে সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং  সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহজাবীন হক বলছেন, ‘একটি পরিবারের মূল সদস্যদের একসঙ্গে অবস্থান করাটা জরুরি। বাবা যখন বিদেশে থাকছেন, তাঁর শিশু কীভাবে বেড়ে উঠছে, সেটা মিস করছেন। বাবা পরিশ্রম করছেন, টাকা পাঠাচ্ছেন, উপহার দিচ্ছেন কিন্তু তাঁর শিশুটিকে সময় দিতে পারছেন না। বাবা যখন কিছুদিনের জন্য বেড়াতে আসেন, তখন সন্তান খুব খুশি হয়। কিন্তু বাবা যখন পাকাপাকিভাবে পরিবারে থাকতে শুরু করে, সন্তানের ভুল ধরিয়ে দেয়, সংসারে মতামত দেয়, সন্তানের ভুল সিদ্ধান্তে হয়তো বকা দেয়, তখন সন্তান বাবার এই ভূমিকাটা মেনে নিতে পারে না। ফলে একধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।’
 

দূরত্ব নিরসনে করণীয়
বাবার সঙ্গে সন্তানের এই দূরত্ব সন্তান ও বাবার সুন্দর সম্পর্ককে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি পরিবারের শান্তিও বিঘ্নিত করে। সন্তানের মধ্যে রাগ, হতাশা প্রভৃতি কাজ করে। ফলে ক্রমশ সে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে ভুল পথে পা বাড়ানোর ঘটনাও বিচিত্র নয়। তাই সম্পর্ক উন্নয়নে বাবাকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। মেহজাবীন হক মনে করেন, ‘বাবা বয়সে অনেক বড়, অভিজ্ঞতা বেশি, তাই সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে বাবাকেই এগিয়ে আসতে হবে।’ প্রবাসী বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক উন্নয়নে মনোবিজ্ঞানী মেহজাবীন হকের পরামর্শ:


১. যেহেতু প্রবাসী বাবার সঙ্গে সন্তানের একটি যোগাযোগগত দূরত্ব থাকে। তাই একে অন্যের পছন্দ-অপছন্দ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও বাবাকে বেশি তত্পর হতে হবে। সন্তানকে সময় দিতে হবে, একসঙ্গে বসে আড্ডা দিতে হবে, মতামত শেয়ার করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত একবার একসঙ্গে খাবার খেতে হবে।


২. সন্তান ভুল সিদ্ধান্ত নিলে, বকাঝকা না করে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে হবে। নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।


৩. বাবা দীর্ঘদিন দূরে থাকায় সন্তানের সঙ্গে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, সেটা দূর করতে মা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারেন। তিনি সন্তানকে বাবার পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে এবং বাবাকে সন্তানের পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। তাঁর ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।


৪. বাবার পাশাপাশি সন্তানকেও বাবার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মতামতকে শ্রদ্ধা করতে হবে। বুঝতে হবে বাবা দূরে থেকে তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যই অর্থ উপার্জন করেছেন, কষ্ট করে বিদেশে থেকেছেন।


মা-বাবার সম্পর্কের ওপর সন্তানের ভবিষ্যত্ অনেকাংশে নির্ভর করে। একটি শিশু তার পরিবার থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়ে থাকে, যা তার পরবর্তী জীবনে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। যেহেতু প্রবাসী বাবার সঙ্গে সন্তানের আগে থেকেই একটি দূরত্ব থাকে, তাই দেশে ফেরার পর শত ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানকে সময় দিতে হবে, সন্তানের সমস্যাগুলোকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি সন্তানেরও বাবার পছন্দ-অপছন্দকে মূল্যায়ন করতে হবে। পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধই দূরত্ব ঘুচিয়ে সম্পর্ককে সুন্দর ও সাবলীল করতে পারে।